
আমাদের সমাজে আরও বেশি সৃজনশীল মানুষ কেন প্রয়োজন?
নতুনভাবে ভাবতে শিখলেই বদলাতে পারে সমাজ
আমরা প্রত্যেকেই চাই আমাদের সমাজ আরও সুন্দর হোক। মানুষ ভালোভাবে বাঁচুক, ছেলেমেয়েরা নিজেদের পছন্দমতো কিছু করার সুযোগ পাক, আর চারপাশের সমস্যাগুলির সমাধান হোক। কিন্তু শুধু ভালো কিছু চাইলেই তো সব পরিবর্তন হয়ে যায় না। তার জন্য প্রয়োজন নতুন চিন্তা, নতুন উদ্যোগ এবং পুরোনো সমস্যাগুলিকে একটু অন্যভাবে দেখার মানসিকতা। আর এখানেই সৃজনশীল মানুষের গুরুত্ব।
সৃজনশীল মানুষ বলতে আমরা অনেক সময় তাঁদেরই বুঝি, যাঁরা ছবি আঁকেন, গান করেন, কবিতা লেখেন কিংবা গল্প তৈরি করেন। কিন্তু সৃজনশীলতা শুধু এই কয়েকটি কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষ যখন কোনো সমস্যার সহজ সমাধান খুঁজে পান, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন কিছু শেখেন কিংবা অন্যদের চেয়ে একটু আলাদাভাবে কোনো বিষয় নিয়ে ভাবেন, তখনও তাঁর সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।
ধরা যাক, একজন শিক্ষক দেখলেন, তাঁর ছাত্রছাত্রীরা একটি বিষয় কিছুতেই ভালোভাবে বুঝতে পারছে না। তিনি যদি একই কথা বারবার না বলে অন্য কোনো সহজ পদ্ধতিতে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেন, সেটিও সৃজনশীলতার পরিচয়। আবার একজন সাধারণ মানুষ যদি অল্প খরচে নিজের এলাকার কোনো সমস্যার সমাধানের উপায় বের করেন, তাঁর চিন্তাও সমাজের কাজে লাগতে পারে। অর্থাৎ, সৃজনশীল হতে হলে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী হওয়া জরুরি নয়। প্রয়োজন চারপাশের জীবনকে মন দিয়ে দেখা এবং নতুন কিছু করার ইচ্ছা।
সৃজনশীল মানুষ একটি সমস্যা কে বিভিন্ন রকম দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে চান, তাই তার সমাধানও নানা রকম ভাবে আসে।সমাজের চিরাচরিত রূপটিকে রেখে সমাজকে কি ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেই ব্যাপারটিকে নিয়ে তাঁরা সবসময় চিন্তা করতে সক্ষম হন।
একইভাবে ভাবলে নতুন পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক কিছুই অভ্যাসের বশে করে যাই। যে কাজ যেভাবে হয়ে আসছে, আমরা অনেক সময় সেভাবেই কাজটি করতে থাকি। তাতে সুবিধা আছে, কিন্তু সব পুরোনো পদ্ধতি যে সব সময় সঠিক বা কার্যকর হবে, এমন নয়।
সময়ের সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বদলায়। আজ যে সমস্যার সমাধান সহজ মনে হচ্ছে, কাল সেই সমস্যাই নতুন রূপ নিতে পারে। তাই শুধু আগের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর না করে নতুনভাবে চিন্তা করার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।
সৃজনশীল মানুষ সাধারণত কোনো বিষয়কে দেখেই থেমে যান না। তাঁরা ভাবেন, এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় আছে কি না। তাঁদের এই প্রশ্ন করার অভ্যাস অন্যদেরও ভাবতে শেখায়। অনেক সময় একটি ছোট্ট নতুন ধারণা থেকেই বড় পরিবর্তনের শুরু হয়। সেই পরিবর্তন হয়তো প্রথমে খুব চোখে পড়ে না, কিন্তু ধীরে ধীরে তার প্রভাব অনেক মানুষের জীবনে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের মতো করে ভাবতে শেখা জরুরি
আমাদের অনেক শিশুই ছোটবেলা থেকে ভালো ফল করার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করে। কিন্তু ভালো নম্বর পাওয়ার পাশাপাশি নিজের বুদ্ধি দিয়ে কোনো বিষয় বোঝা, প্রশ্ন করা এবং নতুন কিছু চেষ্টা করার সুযোগও তাদের প্রয়োজন।
একজন শিক্ষার্থী যদি শুধু বইয়ের উত্তর মুখস্থ করে, তাহলে সে পরীক্ষায় ভালো করতে পারে। কিন্তু বাস্তব জীবনে যখন এমন কোনো সমস্যার মুখোমুখি হবে, যার উত্তর বইয়ে সরাসরি দেওয়া নেই, তখন নিজের চিন্তাশক্তি কাজে লাগানোর প্রয়োজন হবে।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি শিশুদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেয়, তাদের আগ্রহকে গুরুত্ব দেয় এবং নিজের মত প্রকাশের সুযোগ করে দেয়, তাহলে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়বে। ভবিষ্যতে এই শিশুরাই নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে এবং সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজতে পারবে।
কাজের জগতেও সৃজনশীলতার প্রয়োজন
জীবনে প্রত্যেক মানুষই চায় নিজের কাজের মাধ্যমে কিছু করতে, নিজের পরিবারকে ভালো রাখতে এবং ভবিষ্যৎকে একটু নিরাপদ করতে। কিন্তু সব সময় একই পদ্ধতিতে কাজ করে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না।
কেউ হয়তো ছোট একটি ব্যবসা শুরু করেছেন। তিনি যদি মানুষের প্রয়োজন বুঝে নতুন কোনো পরিষেবা দিতে পারেন, তাহলে তাঁর কাজের পরিধি বাড়তে পারে। কেউ হয়তো কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তিনি যদি সময় বাঁচানোর বা কাজের মান উন্নত করার সহজ উপায় খুঁজে পান, তাহলে তাঁর উদ্যোগ অন্যদেরও উপকার করতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সৃজনশীলতা মানেই সব সময় বড় কিছু আবিষ্কার করা নয়। অনেক সময় ছোট একটি পরিবর্তনও মানুষের সময়, পরিশ্রম ও অর্থ বাঁচাতে পারে। এমন চিন্তা ও উদ্যোগ যত বেশি মানুষের মধ্যে দেখা যাবে, তত বেশি নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং সমাজের অর্থনৈতিক জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সৃজনশীলতা মানুষকে আরও মানবিক করে তুলতে পারে
সমাজে আমরা নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে বাস করি। সবার অভিজ্ঞতা এক নয়, সবার চিন্তাভাবনাও এক রকম নয়। তাই মতের অমিল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন আমরা অন্যের কথা শোনার আগেই তাঁকে ভুল বলে ধরে নিই।
সাহিত্যচর্চা, ছবি আঁকা, গল্প বলা কিংবা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে মানুষ অনেক সময় অন্যের অনুভূতি বুঝতে শেখে। সে উপলব্ধি করতে পারে, প্রত্যেক মানুষের জীবনের পেছনে রয়েছে আলাদা অভিজ্ঞতা, আশা, কষ্ট এবং লড়াই।
এই উপলব্ধি আমাদের আরও সহানুভূতিশীল হতে সাহায্য করে। অন্যের অবস্থান থেকে কোনো বিষয়কে দেখার চেষ্টা করলে ভুল বোঝাবুঝি কমতে পারে। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্পর্কও আরও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।
তাই সৃজনশীলতার প্রয়োজন শুধু নতুন কিছু তৈরি করার জন্য নয়; মানুষে মানুষে বোঝাপড়া বাড়ানোর জন্যও।
প্রত্যেক মানুষের সৃজনশীল হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত
সব মানুষ একই ধরনের কাজে দক্ষ হবেন না, এটাই স্বাভাবিক। কেউ ভালো লিখতে পারেন, কেউ হাতে কিছু তৈরি করতে ভালোবাসেন, কেউ নতুন ধারণা নিয়ে ভাবতে পছন্দ করেন, আবার কেউ অন্যের সমস্যার সমাধান করতে আনন্দ পান।
কিন্তু অনেক সময় আমরা নিজের অজান্তেই মানুষের প্রতিভাকে একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে বিচার করি। যে কাজে দ্রুত সাফল্য পাওয়া যায়, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দিই; অন্য ধরনের আগ্রহকে ততটা মূল্য দিই না। এর ফলে অনেক মানুষ নিজের দক্ষতা প্রকাশ করার সাহস হারিয়ে ফেলেন।
আমাদের উচিত এই মানসিকতা বদলানো। কেউ নতুন কিছু করার চেষ্টা করলে তাঁকে শুরুতেই নিরুৎসাহিত না করে তাঁর কাজটি বুঝতে চেষ্টা করা দরকার। সব নতুন ধারণা সফল হবে না, কিন্তু চেষ্টা করার সুযোগ না পেলে ভালো কোনো ধারণা বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে না।
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের দায়িত্ব হল এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ নিজের আগ্রহ অনুযায়ী শিখতে পারে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারে এবং অভিজ্ঞতা থেকে উন্নতি করতে পারে।
ছোট ছোট উদ্যোগ থেকেই বড় পরিবর্তন আসতে পারে
সমাজের পরিবর্তনের জন্য সব সময় বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না। নিজের পাড়ার শিশুদের পড়াশোনায় সাহায্য করা, অপ্রয়োজনীয় জিনিস নতুনভাবে ব্যবহার করা, মানুষের দৈনন্দিন অসুবিধা কমানোর উপায় খোঁজা কিংবা নতুন কিছু শেখার আগ্রহ অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া—এসবও গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
একজন মানুষের ভালো উদ্যোগ দেখে অন্য কেউ উৎসাহিত হতে পারেন। তারপর সেই উদ্যোগ আরও কয়েকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এভাবেই ছোট ছোট প্রচেষ্টা একসময় বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।
তবে সৃজনশীলতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ থাকাও জরুরি। নতুন কিছু করার আগে তার প্রভাব অন্য মানুষের ওপর কীভাবে পড়বে, সেটিও ভাবতে হবে। যে উদ্যোগ মানুষের উপকার করে, সমস্যার সমাধান করে এবং অন্যের প্রতি সম্মান বজায় রাখে, সেই উদ্যোগই সমাজকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
শেষ কথা
আমাদের সমাজে আরও বেশি সৃজনশীল মানুষ প্রয়োজন, কারণ পৃথিবীকে শুধু আগের মতো ধরে রাখলেই চলবে না; মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে আরও ভালো করে গড়ে তোলার চেষ্টাও করতে হবে।
এর জন্য প্রত্যেককে শিল্পী, লেখক কিংবা আবিষ্কারক হতে হবে না। নিজের কাজের মধ্যে নতুনত্ব আনা, কোনো সমস্যাকে অন্যভাবে দেখা, প্রশ্ন করতে শেখা এবং অন্যের ভালো উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়ার মধ্য দিয়েও সৃজনশীলতার চর্চা করা সম্ভব।
আমরা যদি শিশুদের কৌতূহলকে গুরুত্ব দিই, তরুণদের নতুন কিছু করার সুযোগ দিই এবং বড়দেরও নতুনভাবে শেখার আগ্রহকে সম্মান করি, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়বে।
একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ শুধু নিজের উন্নতির কথা ভাবে না, বরং নিজের চিন্তা, দক্ষতা ও উদ্যোগ দিয়ে অন্যের জীবনকেও একটু সহজ, সুন্দর এবং আনন্দময় করে তোলার চেষ্টা করে।
